শতভাগ রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠান বন্ডেড সুবিধায় শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ পেলেও আংশিক রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো তা পায় না। তাদের এ সুবিধা দিতে সরকারের একটি সংস্থা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে এ-সংক্রান্ত সুবিধা-অসুবিধা তুলে ধরে সুপারিশ পাঠিয়েছে। এনবিআর-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ বিষয়ে কাজ চলছে। এতে রফতানি বাড়লেও অসুবিধা হলো, যদি এর অপব্যবহার হয় তবে দেশের ক্ষতি হবে ও শুল্ককর আদায় কমবে।
সরকারি সংস্থাটি বলছে, বর্তমানে শতভাগ রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠান বন্ডেড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ পাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক শিল্প, ট্যানারি ও চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, জাহাজ নির্মাণ শিল্প, প্রচ্ছন্ন রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান, ডিপ্লোম্যাটিক বন্ড এবং রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার (ইপিজেড) বন্ড প্রতিষ্ঠানের প্রায় ছয় হাজার কারখানা।
যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদিত পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রির পাশাপাশি বিদেশেও রফতানি করে থাকে, তারা আংশিক রফতানিকারক হিসেবে পরিচিত। বিদ্যমান শুল্কনীতি অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ককর পরিশোধ করতে হয় এবং পরবর্তী সময়ে ডিউটি ড্র ব্যাক পদ্ধতিতে পণ্য রফতানি নিশ্চিত হলে অডিটের পর পরিশোধিত শুল্ককর ফেরত দেয় এনবিআর।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের তথ্যের বরাত দিয়ে সংস্থাটি বলছে, বাংলাদেশে প্রায় ৭৫০টি রফতানিযোগ্য পণ্য রয়েছে, যার মধ্যে ৬৫৯টি পণ্য লোহা ও ইস্পাত, রাসায়নিক, ইলেকট্রনিকস, বৈদ্যুতিক ও ফার্নিচার খাতের আংশিক রফতানিমুখী শিল্পের অন্তর্গত। এ শিল্পগুলোয় পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে কাঁচামালের প্রায় ৮০ শতাংশ আমদানি এবং ২৫-৬৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। প্রকৃতপক্ষে রফতানি আয় প্রত্যাবাসনের পর ডিউটি ড্র ব্যাক পদ্ধতিতে পরিশোধিত শুল্ককর ফেরত পেতে প্রায় তিন-পাঁচ বছর সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। এতে রফতানিকারকরা মূলধন প্রবাহ সংকটের সম্মুখীন হচ্ছেন এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।
সংস্থাটি বলছে, এলডিসি উত্তরণের পর পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা ও রফতানি প্রণোদনা থাকছে না। তাই এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় রফতানি বাজার সম্প্রসারণ ও পণ্য বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে আমদানি নীতি আদেশ ২০২১-২৪ এবং রফতানি নীতি ২০২৪-২৭ অনুযায়ী, আংশিক রফতানিমুখী শিল্পগুলোর রফতানি পণ্যের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য শুল্ককরের জন্য ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে বন্ড সুবিধা দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এছাড়া এনবিআরের শুল্ক রেয়াত ও প্রত্যর্পণ পরিদপ্তরের (ডেডো) মাধ্যমে পরিশোধিত আমদানি কর ফেরতের জন্য বিদ্যমান প্রক্রিয়াটি (নথিপত্র জমা ও তা পরবর্তী সময়ে অডিট) সময়সাপেক্ষ। এ অবস্থায় রফতানিকারকরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলায় ডিউটি ড্র ব্যাক সুবিধার মূল লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে না। এ পদ্ধতির বিকল্প হিসেবে আংশিক রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিশোধিত শুল্ককরের সমান ব্যাংক গ্যারান্টি সুবিধা দেয়া যেতে পারে। এতে কাঁচামাল আমদানিতে মূলধন প্রবাহের সংকট কেটে যাবে এবং উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে। তাছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি ফি (শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ) অতিসামান্য, যা আংশিক রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের সামর্থ্যের মধ্যেই রয়েছে। এ পদ্ধতিতে রফতানিকারক কাঁচামাল আমদানি করে পরবর্তী সময়ে রফতানি না করলে অর্থাৎ রাজস্ব ফাঁকির আশঙ্কা থাকলে শুল্ক কর্তৃপক্ষ ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়ন করে শুল্ক আদায় করতে পারবে।
এদিকে ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে আংশিক রফতানিকারকদের বন্ড সুবিধা প্রদানে কিছু চ্যালেঞ্জও দেখছে সরকারি সংস্থাটি। তারা বলছে, ব্যাংক গ্যারান্টির সুবিধা প্রাপ্তির বিষয়টি নির্ভর করবে গ্রাহক (রফতানিকারক) ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সম্পর্কের ওপর। এক্ষেত্রে ক্ষুদ্র রফতানিকারকদের ব্যাংক গ্যারান্টি প্রাপ্তি ও জামানত হিসেবে জমা একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এ বিষয়ে এনবিআরের সদস্য (কাস্টমস: অডিট, আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য) কাজী মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টাকা ছাড়া ব্যাংক কোনো গ্যারান্টি দেয় না। আবার ব্যাংক গ্যারান্টি কোনো টাকা না। এর স্বত্বাধিকারী হচ্ছেন ব্যবসায়ী। তার অনুমতি ব্যতীত তা ব্যাংক ক্যাশ করতে পারবে না। ফলে পদে পদে লিটিগেশন হতে থাকবে। ব্যবসায়ীদের প্রবণতা হচ্ছে টাকা ছাড়া ব্যবসা করা।’
তবে সার্বিক বিবেচনায় সুবিধাটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে পোশাক খাতের পাশাপাশি কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, রাসায়নিক পণ্য, ফার্নিচার, হালকা প্রকৌশলজাত পণ্য প্রভৃতি খাতে রফতানি আয়ে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এ বিষয়ে এনবিআরের সাবেক সদস্য ফরিদ উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যথাযথ কাস্টমস নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে ব্যবস্থাটি আংশিক রফতানিকারকদের জন্য বর্তমানের অকার্যকর ডিউটি ফেরত ব্যবস্থার চেয়ে মন্দের ভালো হবে। রফতানিকারকের ব্যাংকসহ পুরো কার্যক্রম অ্যাসাইকুডা সিস্টেমের সঙ্গে ইন্টিগ্রেটেড করা সম্ভব হলেই কেবল তা কাজ করবে। অন্যথায় অপব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে।’ এছাড়া সংশ্লিষ্ট খাতের রফতানি সম্ভাবনা ও রফতানিকারকের সততার ওপরও এর কার্যকারিতা নির্ভর করে বলে জানান তিনি।
বিষয়টি নিয়ে এনবিআর কাজ করছে বলে বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। তিনি বলেন, ‘কাঁচামাল আমদানিতে ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে আংশিক রফতানিকারকদের বন্ড সুবিধা দিলে রফতানি বাড়বে। কিন্তু অসুবিধা হলো যদি এর অপব্যবহার হয় তবে দেশের ক্ষতি হবে, শুল্ককর আদায় কমবে।’